মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে একের পর এক কৌশলগত সাফল্য পেলেও, তিন মাস পর বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে; তিনি কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটাই হারছেন?
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় না দেওয়ার অবস্থান এবং দেশটির ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা অক্ষত থাকায় অনেক বিশ্লেষকের মতে, সামরিক সাফল্যকে ভূরাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দিতে পারছেন না ট্রাম্প।ট্রাম্প বারবার পূর্ণ বিজয়ের দাবি করলেও তা ক্রমেই ফাঁপা শোনাচ্ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। কারণ একদিকে অনিশ্চিত কূটনৈতিক আলোচনা, অন্যদিকে হামলা পুনরায় শুরুর হুমকি; দুইয়ের মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সংঘাতের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা আরও দুর্বল অবস্থানে চলে যেতে পারে, আর সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান উল্টো আরও শক্তিশালী দরকষাকষির অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। কারণ তারা দেখিয়েছে, চাইলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।যদিও সংকট এখনো শেষ হয়নি এবং কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলে ট্রাম্প সম্মানজনকভাবে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। তবে অন্যরা অনেক বেশি হতাশাবাদী।মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলা বলেন, তিন মাস পেরিয়ে গেছে। যে যুদ্ধটি ট্রাম্পের জন্য স্বল্পমেয়াদি সহজ বিজয় হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তার বৈদেশিক নীতির রেকর্ডকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন দুই বিকল্পের সামনে দাঁড়িয়ে; একটি অসম্পূর্ণ চুক্তি মেনে নেওয়া অথবা সামরিক অভিযান বাড়িয়ে আরও দীর্ঘ সংকটে জড়িয়ে পড়া।
যদিও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ওলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেন, অপারেশন এপিক ফিউরিতে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়েও গেছে।
যুদ্ধে যাওয়ার সময় ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করা, অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা কমানো এবং দেশটির জনগণের জন্য শাসক পরিবর্তন সহজ করা।
কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পেইনকফ বলেন, ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু তাদের শাসকদের কাছে শুধু টিকে থাকাটাই সাফল্য।
তিনি বলেন, ইরান বুঝেছে যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং এর জন্য তাদের খুব বেশি মূল্যও দিতে হচ্ছে না।
ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় মজুত এখনো ভূগর্ভে রয়ে গেছে, যা পুনরুদ্ধার করে ভবিষ্যতে অস্ত্রমানের উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব।
অন্যদিকে ইরান দাবি করে আসছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ এমন এক যুদ্ধে সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যার বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শই করা হয়নি।
একই সময়ে চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতা এবং অস্ত্রভান্ডারের ঘাটতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রবার্ট কাগান তার ‘চেকমেট ইন ইরান’ শীর্ষক বিশ্লেষণে লিখেছেন, এই সংঘাতের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান থেকেও বড় কৌশলগত ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন কোনো চূড়ান্ত মার্কিন বিজয়ও আসবে না, যা ইতোমধ্যে হয়ে যাওয়া ক্ষতির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে।
সূত্র : রয়টার্স