• বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন

অভিযোগ-প্রশ্নে জর্জরিত জুলাই হত্যার বিচার

২৪ ঘন্টা / ২
বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। এই অভিযোগ কখনো ঘুষ লেনদেনের, কখনো দায়ী ব্যক্তিকে আসামি না করে ছেড়ে দেওয়ার। এর আগে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও আরেকজন প্রসিকিউটরের (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর) বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন অন্য এক প্রসিকিউটর। আশুলিয়ায় হত্যার পর লাশ পোড়ানোর ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের আসামি করা হয়নি মর্মে অভিযোগ তুলেছেন ওই মামলারই দণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি। সবশেষ আওয়ামী লীগের কারাবন্দি সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা ঘুষ চেয়েছেন ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর।সাবেক সংসদ সদস্যের পরিবারের কাছে এক প্রসিকিউটরের ১ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘১ কোটি টাকা ঘুষ চেয়ে অডিও ফাঁসের ঘটনায় পুরো বিচার প্রক্রিয়া শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’ তিনি বলেন, ‘এ রকম যদি কোনো বিষয় হয়, তাহলে তো অবশ্যই আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমাদের ভাবমূর্তির (ইমেজ) সংকট হয়।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নির্বিচারে গুলি চালায়। প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারায় আন্দোলনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচারের সিদ্ধান্ত নেয়। পুনর্গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের তিনটি মামলায় বিচার শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তিপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পলাতক। আর যারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাদের অধিকাংশেরই সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি। বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে। এ ছাড়া অনেক তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিছু অভিযুক্তকে আসামি না করেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় এসআই আবজালুল হককে রাজসাক্ষী করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।সাইমুম রেজা। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, তিনি তার আগের পেশা শিক্ষকতায় ফিরতে চান।

দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন প্রসিকিউটর নিজেই: ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলামকে। তিনি একসময় এ আদালতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী ছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। সেদিনই প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ রাজসাক্ষী ঠিক করার ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তারপরই শুরু হয় তা নিয়ে আলোচনা।

জানা যায়, ‘কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি পোস্ট দেওয়া হয় এই শিরোনামে—‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ সেই পোস্টে দুটি মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। তিনি সেখানে সহকর্মী তাজুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। সুলতান মাহমুদ সেখানে লেখেন, ‘দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।’

গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি (রাজসাক্ষী) পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হকের স্ত্রীকে সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইনের কক্ষে ঢুকতে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন সুলতান মাহমুদ। তিনি লিখেছেন, ‘তা দেখার পর তাজুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাজুল ইসলাম এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে বকাঝকা করেছিলেন। তামীম তখন সবার সামনে এসআই আবজালের স্ত্রীর তার কক্ষে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু টাকার বিনিময়ে আবজালকে রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’সাবেক আইজিপি আল-মামুনকে কেন রাজসাক্ষী করা হলো, সেই অভিযোগও তোলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। তিনি দাবি করেন, “আল-মামুনকে নিয়ে ‘রাজসাক্ষীর নাটক’ বানান তাজুল ইসলাম।” চানখাঁরপুলের মামলায়ও পুলিশের এসআই মো. আশরাফুল ইসলামকে আসামি না করে সাক্ষী করার পেছনে দুর্নীতি রয়েছে বলে দাবি করেন সুলতান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছেন, এ রকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামির তালিকায় রংপুর মহানগর পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার আল ইমরান হোসেনকে না রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুলতান মাহমুদ। তিনি লিখেছেন, ‘রংপুরের আবু সায়ীদের মামলায় এসি ইমরানকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষী আদালতে এসে বলেছে।’

রাজসাক্ষী নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ‘প্রকাশিত সংবাদের ব্যাপারে আমার স্পষ্ট বক্তব্য’ শিরোনামে লেখেন, ‘কিছুসংখ্যক গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আমার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনৈক প্রসিকিউটরের বরাতে কিছু বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে ওই বক্তব্যগুলো জঘন্য মিথ্যাচার, তথ্য প্রমাণবিহীন এবং আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুরভিসন্ধি থেকে করা হয়েছে। ওই বিদ্বেষপ্রসূত ও অভিযোগগুলো সর্বতোভাবে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।’

এ অভিযোগ প্রমাণের চ্যালেঞ্জ দিয়ে তাজুল ইসলাম লেখেন, ‘আমি মনে করি, পতিত স্বৈরাচার এবং গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিকৃত এবং চলমান বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহল সংঘবদ্ধভাবে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে এই বিচার আর কোনোভাবে অগ্রসর না হতে পারে।’

‘যারা জড়িত তাদের আনা হয়নি’: জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয় গত ৫ ফেব্রুয়ারি। রায়ের পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পুলিশের তৎকালীন এসআই আবদুল মালেক। ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়া থেকে বের হওয়ার সময় উচ্চস্বরে তিনি বলেন, ‘এএসআই মনির আগুন দিয়েছে। রাজসাক্ষী (এসআই শেখ আবজালুল হক) জড়িত ছিল। মিথ্যা মামলায় কেন সাজা দিল? যারা জড়িত, তাদের আনা হয়নি। আল্লাহ বিচার করবে।’

আবু সাঈদ হত্যা মামলা নিয়ে অভিযোগ তার ভাইয়ের: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। মামলাটি বর্তমানে রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। এ মামলায় মোট আসামি ৩০ জন। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন আবু সাঈদের বড় ভাই মো. রমজান আলী। তিনি অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, ‘আবু সাঈদ হত্যার ভিডিওতে দেখা যায় একজন পুলিশ গুলি করে তাকে হত্যা করে। রংপুরে মামলা করার সময় সিসিটিভি ফুটেজ ও আবু সাঈদের সহপাঠীদের নিয়ে মামলা করি। সেখানে মো. আল ইমরান হোসেনকে ৫ নম্বর আসামি করা হয়। অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. আল ইমরান হোসেনের ত্রুটি খুঁজে পাননি। আমি শুনেছি এ পুলিশ কর্মকর্তা তিন কোটি টাকার জায়গা বিক্রি করে মামলা থেকে নাম কাটাতে ঘুষ দিয়েছেন।’

ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত, রায় ঘোষণা স্থগিত চেয়ে আবেদন: জুলাই আন্দোলনে রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যা মামলায় গত ৫ মার্চ রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু নতুন চিফ প্রসিকিউটর দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই মামলার তদন্ত ত্রুটিপূর্ণ থাকায় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ বাদ পড়ায় রায় না দিতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে প্রসিকিউশন। মামলায় নতুন ডিজিটাল তথ্য প্রমাণ হাতে আসায় এ আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন: কোটি টাকার ঘুষ দাবির ফাঁস হওয়া অডিওর তদন্ত করার আশ্বাস দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গতকাল বলেছেন, ‘যে অডিওটা এসেছে, যদি ফরমাল অভিযোগ আমার কাছে নাও আসে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মানে আমার প্রসিকিউশনের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে একটা অভ্যন্তরীণ তদন্ত করব। এই পার্টিকুলার বিষয়ে তো তদন্ত করবই, ৫ আগস্টের পর আমাদের এই ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর, সব বিষয় আমি অভ্যন্তরীণ একটা কমিটি গঠন করে সবটাই তদন্ত করে দেখব।’

জুলাই আন্দোলনে শহীদ ইমাম হোসেন তায়িমের ভাই, জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আউয়াল ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, ‘কলরেকর্ড একটি ঘটনায় ফাঁস হয়েছে। কিন্তু এমন আরও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এগুলো নিয়ে আমি নিয়মিতই কথা বলতাম প্রসিকিউশনের সঙ্গে। এমনকি জলজ্যান্ত ঘটনার চাক্ষুষ তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বাহিনীর প্রধানকে রাজসাক্ষী করার বিরোধিতা করেছিলাম। বিষয়টি নিয়ে তখনকার চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে আমাকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, “সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও তার ভাইসহ আরও কয়েকজন মিলে প্রসিকিউশনে ‘বাকশাল’ কায়েম করে। তারা সেখানে যা বলত, তাই হতো। তাদের ইশারায় কাকে আসামি করা হবে আর কাকে আসামি করা হবে না, তাও ঠিক করা হতো। তারা জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে। তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।’


এই ক্যাটেগরির আরও খবর